এসএসসি ২০২২ বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় এ্যাসাইনমেন্ট উত্তর

এসএসসি ২০২২ বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় এ্যাসাইনমেন্ট উত্তর

অ্যাসাইনমেন্টঃ তােমার পরিবারে বসবাসরত ষাটোর্ধ তােমার দাদা বা নানার কাছে তুমি ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে জানতে পারলাে যে যুদ্ধ শুরু হলে আওয়ামী লীগের উদ্যোগে গঠিত মুজিবনগর সরকার যুদ্ধ পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

মুক্তিযুদ্ধে রাজনৈতিক দলসহ সকলের ভূমিকা মূল্যায়ন করে নির্দেশনা অনুসরণে একটি প্রতিবেদন প্রণয়ন কর।

শিখনফল/বিষয়বস্তুঃ মুজিবনগর সরকারের ভূমিকা মূল্যায়ন করতে পারবে। মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, ছাত্র, পেশাজীবী, নারী, সাধারণ জনগণের ভূমিকা মূল্যায়ন করতে পারবে। দেশের প্রতি ভালােবাসা, গণতন্ত্র এবং মুক্তিযােদ্ধাদের প্রতি শ্রদ্ধা পােষণ করবে।

নির্দেশনা (সংকেত/ধাপ/পরিধি): ১. মুজিবনগর সরকারের গঠন ও কার্যক্রম বর্ণনা। ২. মুক্তিযুদ্ধে সাধারণ জনগণ ও পেশাজীবীদের ভূমিকা ব্যাখ্যা। ৩. স্বাধীনতা অর্জনে তৎকালীন সরকারের রাজনৈতিক ব্যক্তিদের অবদান মূল্যায়ন।

এসএসসি ২০২২ বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় এ্যাসাইনমেন্ট উত্তর


মুক্তিযুদ্ধে রাজনৈতিক দলসহ সকলের ভূমিকা মূল্যায়ন

ভূমিকাঃ
স্বাধীনতার ঘোষণা দেওয়া মাত্রই ১৫ দিনের মাথায় সরকার গঠন হবে তা অকল্পনীয় ছিল পাকিস্তানিদের কাছে।কিন্তুু দুর্দান্ত প্রতাপে ঘুরে দাঁড়ায় স্বাধীন বাংলাদেশ’। কারণ গঠিত হয় গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ অস্থায়ী সরকার বা মুজিব সরকার।এই অস্থায়ী সরকার এর মধ্য দিয়েই পরিকল্পিত কায়দায় মুক্তিবাহিনীকে সংগঠিত ও সমন্বয় সাধন করে পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে সশস্ত্র যুদ্ধ পরিচালনা ও স্বাধীন বাংলাদেশের পক্ষে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সমর্থন আদায় করেছিল মুজিবনগর সরকার।

মুজিবনগর সরকার গঠনঃ
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে মুজিবনগর সরকার গঠন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নামে মেহেরপুর জেলার বৈদ্যনাথতলার আম্রকাননে নামকরণ করা হয় মুজিবনগর। মুক্তিযুদ্ধকে সঠিকভাবে পরিচালনা, সুসংহত করা এবং মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে বিশ্ব জনমত গঠনের লক্ষ্যে ১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল নির্বাচিত প্রতিনিধিদের নিয়ে মুজিবনগর সরকার গঠন করা হয়। ঐ দিনই আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষিত হয়’ বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা আদেশ ‘।মুজিবনগর সরকার শপথ গ্রহণ করে ১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল। শপথ গ্রহণের মধ্য দিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশ সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়।


মুজিবনগর সরকারের কার্যক্রমঃ
১৯৭০-৭১ সালের নির্বাচনে বিজয়ী জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য দ্বারা মুজিবনগর সরকার গঠন করা হয়। মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনা এবং বাংলাদেশের পক্ষে বিশ্ব জনমত সৃষ্টি করা ছিল এর সরকারের প্রধান উদ্দেশ্য। মুজিবনগর স্বাধীন বাংলাদেশ সরকারের কাঠামো ছিল নিম্নরূপঃ

  • রাষ্ট্রপতি ও মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক : বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান
  • উপ রাষ্ট্রপতি : সৈয়দ নজরুল ইসলাম (বঙ্গবন্ধুর অবর্তমানে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি)
  • প্রধানমন্ত্রী : তাজউদ্দীন আহমদ
  • অর্থমন্ত্রী : এম. মনসুর আলী
  • স্বরাষ্ট্র, ত্রাণ ও পুনর্বাসন মন্ত্রী : এ. এইচ. এম কামরুজ্জামান
  • পররাষ্ট্র ও আইনমন্ত্রী : খন্দকার মোশতাক আহমেদ

স্বাধীন বাংলাদেশ সরকারকে উপদেশ ও পরামর্শ প্রদানের জন্য একটি উপদেষ্টা পরিষদ গঠন করা হয়। ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির (ভাসানী ন্যাপ) মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী, ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির( মোজাফফর ন্যাপ) অধ্যাপক মোজাফ্ফর আহমেদ, কমিউনিস্ট পার্টির কমরেড মনি সিং, জাতীয় কংগ্রেসের মনোরঞ্জন ধর, তাজউদ্দীন আহমদ (বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী) ও খন্দকার মোশতাক আহমেদ (বাংলাদেশ সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও আইনমন্ত্রী) কে নিয়ে মোট ৬ সদস্য নিয়ে উপদেষ্টা পরিষদ গঠিত হয়। মুক্তিযুদ্ধে প্রধান সেনাপতি ছিলেন কর্নেল (অব.) এম. এ. জি ওসমানী। বাঙালি কর্মকর্তাদের নিয়ে সরকার প্রশাসনিক কাজ পরিচালনা করেন। এতে মোট ১২ টি মন্ত্রণালয় বিভাগ ছিল। এগুলো হচ্ছে প্রতিরক্ষা, পররাষ্ট্র, অর্থ-শিল্প-বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, মন্ত্রিপরিষদ সচিবালয়, সাধারন প্রশাসন, স্বাস্থ্য ও কল্যাণ বিভাগ, ত্রাণ ও পুনর্বাসন বিভাগ, প্রকৌশল বিভাগ, পরিকল্পনা কমিশন, যুব ও অভ্যর্থনা শিবিরের নিয়ন্ত্রণ বোর্ড ইত্যাদি।

মুজিবনগর সরকার বিশ্বের বিভিন্ন দেশের গুরুত্বপূর্ণ শহরে (কলকাতা, দিল্লি, লন্ডন, ওয়াশিংটন, নিউ ইয়র্ক, স্টকহোম) বাংলাদেশ সরকারের মিশন স্থাপন করেন। এসব মিশন বাংলাদেশ সরকারের পক্ষে প্রচারণা ও সমর্থন আদায়ের চেষ্টা করে। সরকার বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী কে বিশেষ দূত নিয়োগ দেয়।তিনি মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে বিশ্বের নেতৃত্ব ও জনগণের সমর্থন আদায়ের জন্য কাজ করেন।

১০ এপ্রিল মুজিবনগর সরকার গঠিত হওয়ার পর মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনার জন্য সামরিক-বেসামরিক জনগণকে নিয়ে একটি মুক্তিযুদ্ধ বাহিনী গড়ে তোলার উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। ১০ এপ্রিল সরকার ৪ টি সামরিক জোনে বাংলাদেশকে ভাগ করে চারজন সেক্টর কমান্ডার নিযুক্ত করে। ১১ এপ্রিল তা পুনঃনির্ধারিত করে ১১ টি সেক্টরে বিভক্ত করা হয়। এছাড়া বেশকিছু সাব-সেক্টর এবং তিনটি ব্রিগেড ফোর্স গঠিত হয়। এসব বাহিনীতে পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে কর্মরত বাঙালি সেনা কর্মকর্তা সেনাসদস্য পুলিশ ইপিআর ও বিমান বাহিনীর সদস্যগণ যোগদান করেন। প্রতিটি সেক্টরে নিয়মিত সেনা গেরিলা ও সাধারণ যোদ্ধা ছিল। এরা মুক্তিযোদ্ধা মুক্তির পথ নামে পরিচিত ছিল। এসব বাহিনীতে দেশের ছাত্র-যুবক, নারী, কৃষক, রাজনৈতিক দলের কর্মী সমর্থক, শ্রমিকসহ বিভিন্ন পেশার মানুষ অংশ নিয়েছিল।

বিভিন্ন প্রশিক্ষণ ক্যাম্পে প্রশিক্ষণ শেষে যোদ্ধাগণ দেশের অভ্যন্তরে প্রবেশ করে পাকিস্তানের সামরিক ছাউনি বা আস্তানায় হামলা চালায়। মুক্তিযুদ্ধের সরকারের অধীন বিভিন্ন বাহিনীর ছাড়াও বেশ কয়েকটি বাহিনী দেশের অভ্যন্তরে স্বতঃস্ফূর্তভাবে গড়ে উঠেছিল। এসব সংগঠনের স্থানীয়ভাবে পাকিস্তান বাহিনী এবং রাজাকার বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধের গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছিল। যেমন, টাঙ্গাইলে কাদেরিয়া বাহিনীর কথা স্মরণীয় হয়ে আছে। ১৯৭১ সালে মুক্তিযোদ্ধাগণ মুজিবনগর সরকারের নেতৃত্বে দেশকে পাকিস্তানিদের দখলমুক্ত করার জন্য রণক্ষেত্রের যুদ্ধ করেছেন, অনেকে দেশের জন্য প্রাণ দিয়েছে অনেক আহত হয়েছে।


মুক্তিযুদ্ধে সাধারণ জনগণ ও পেশাজীবীদের ভূমিকাঃ
১৯৭১ সালে ২৫ মার্চ নিরস্ত্র জনগণের ওপর পাকিস্তানি সেনাবাহিনী আক্রমণ চালালে বাঙালি ছাত্রজনতা পুলিশ ইপিআর( ইস্ট পাকিস্তান রাইফেল) সাহসিকতার সাথে তাদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায়। বিনা প্রতিরোধে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীকে বাঙালিরা ছাড় দেয়নি। দেশের জন্য যুদ্ধ করতে গিয়ে বহু মুক্তিযোদ্ধা বিভিন্ন রণাঙ্গনে শহীদ হন, আবার অনেকে গুলিতে মারাত্মকভাবে আহত হন। তাই মুক্তিযোদ্ধাদের এ ঋণ কোনও দিন শোধ হবে না। তারা ছিল দেশপ্রেমিক’ অসীম সাহসী এবং আত্মত্যাগের উদ্বুদ্ধ যোদ্ধা। মুক্তিযুদ্ধে বেঙ্গল রেজিমেন্টের সৈনিক, ইপিআর, পুলিশ, আনসার, কৃষক-শ্রমিক ছাত্র-ছাত্রীসহ বিভিন্ন পেশার মানুষ অংশগ্রহণ করে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে সর্বস্তরের বাঙালিরা অংশগ্রহণ করে। তাই এই যুদ্ধকে ‘গণযুদ্ধ বা জনযুদ্ধ’ বলা হয়। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের মূল নিয়ামক শক্তি ছিল জনগণ। তাই মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, ছাত্র, পেশাজীবী নারী, সংস্কৃতিকর্মীসহ জনসাধারন নিজ নিজ অবস্থান থেকে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে।


রাজনৈতিক দলঃ
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী প্রধান রাজনৈতিক দলটি হল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ। রাজনৈতিক নেতৃত্বই মুক্তিযুদ্ধের গতি প্রকৃতি নির্ধারণ করে। আওয়ামীলীগ প্রথমে পূর্ব বাংলার জনগণকে স্বাধিকার আন্দোলনের সংগঠিত করে,এরপর ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয় লাভের পর জনগণকে স্বাধীনতা আন্দোলনে উদ্বুদ্ধ করে। রাজনৈতিক নেতৃত্ব মুক্তিযুদ্ধকে সফল করার ক্ষেত্রে সকল শক্তি মেধা ও রাজনৈতিক দূরদর্শিতার পরিচয় দিতে সক্ষম হয়। মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বদান, ভারতে ১ কোটি শরণার্থীর ত্রাণ ও আশ্রয়ের ব্যবস্থা, মুক্তিযোদ্ধা ও গেরিলা যোদ্ধাদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা, স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র পরিচালনা এবং মুক্তিযুদ্ধের প্রতি বিশ্ব জনমত গড়ে তোলার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে সরকার ও রাজনৈতিক নেতৃত্ব।

বাংলাদেশের অভ্যন্তরে পাকবাহিনীর সমর্থনে মুসলিম লীগ, জামায়াতে ইসলামী,পিডিসহ কতিপয় দল মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করে। দলগুলো শান্তি কমিটি।,রাজাকার, আলবদর, আলশামস, নামক বিশেষ বাহিনী গঠন করে। এসব বাহিনী হত্যা, লুটতরাজ, অগ্নিসংযোগ, নারীর সম্ভ্রমহানির মতো মানবতাবিরোধী কর্মকাণ্ডের লিপ্ত ছিল। স্বাধীনতাবিরোধী এ বাহিনীগুলো মুক্তিযোদ্ধার ছাড়াও ১৯৭১ সালের ১৪ ডিসেম্বর বাঙ্গালীদের মেধাশূন্য করার উদ্দেশ্যে পরিকল্পিতভাবে এ দেশের শ্রেষ্ঠ বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করে।

ছাত্রসমাজঃ
পাকিস্তানের ২৪ বছরের বাঙালি জাতির স্বার্থ সংশ্লিষ্ট সকল আন্দোলনে গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা পালন করেছে এদেশের ছাত্র সমাজ। ১৯৪৮ থেকে ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ১৯৬২ ও ১৯৬৪ সালের শিক্ষা কমিশন রিপোর্টে বিরুদ্ধে আন্দোলন, ১৯৬৬ সালে ছয় দফার আন্দোলন, ১৯৬৮ সালে ১১ দফার আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, ১৯৭০ এর নির্বাচন, ১৯৭১ সালের মার্চ মাসে বঙ্গবন্ধুর অসহযোগ আন্দোলন, প্রতিটি ক্ষেত্রে ছাত্রসমাজ অগ্রণী ভূমিকা পালন করে। ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে স্কুল কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীদের বিরাট অংশ সরাসরি মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেয়। অনেকে প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে দেশের অভ্যন্তরে প্রবেশ করে পাকিস্তান হানাদার বাহিনীকে প্রতিরোধ করে। মুক্তিবাহিনীকে একক গোষ্ঠী হিসেবে ছাত্র-ছাত্রীদের সংখ্যা ছিল সবচেয়ে বেশি। মুক্তিবাহিনীর অনিয়মিত শাখায় এক বিরাট অংশ ছিল ছাত্র। মুক্তিযুদ্ধের একপর্যায়ে মুজিব বাহিনী গঠিত হয়েছিল মূলত ছাত্র-ছাত্রীদের নিয়ে। ছাত্রলীগ ও ছাত্র ইউনিয়ন কর্মীরা বিভিন্ন এলাকার সংগঠিত হয়ে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে। মুক্তিযুদ্ধের ছাত্রসমাজের মহান আত্মত্যাগ ব্যতীত স্বাধীনতা অর্জন কঠিন হতো।


পেশাজীবীঃ
সাধারণ অর্থে যারা বিভিন্ন পেশায় নিয়োজিত তারাই হলেন পেশাজীবী। যেমন, শিক্ষক, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, শিল্পী-সাহিত্যিক, প্রযুক্তিবিদ, সাংবাদিক, আমলা, বিজ্ঞানী সহ বিভিন্ন সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারীবৃন্দ। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে এদের ভূমিকা ছিল অনন্য ও গৌরবদীপ্ত। পেশাজীবীদের বড় অংশ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন। পেশাজীবীরা মুজিবনগর সরকারের অধীনে পরিকল্পনা সেল গঠন করে বিশ্ববাসীর কাছে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের তথ্য সরবরাহ, সাহায্যের আবেদন, বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফোরামে বক্তব্য প্রধান, শরণার্থীদের উৎসাহ প্রদান ইত্যাদি ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। পেশাজীবীদের মধ্যে অনেকে মুক্তিযুদ্ধে শহীদ হন।

মুক্তিযুদ্ধে নারীঃ
মুক্তিযুদ্ধে নারীদের ভূমিকা ছিল গৌরবোজ্জ্বল। ১৯৭১ সালের মার্চের প্রথম থেকে দেশের প্রতিটি অঞ্চলে যে সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়, তাতে নারীদের বিশেষ করে ছাত্রীদের অংশগ্রহণ ছিল সতঃস্ফুর্ত।মুক্তিযোদ্ধা শিবিরে পুরুষের পাশাপাশি নারীরাও অস্ত্র চালনা ও গেরিলা যুদ্ধের প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে সরাসরি মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেয়। অপরদিকে সহযোদ্ধা হিসেবে আহত মুক্তিযোদ্ধাদের সেবা-শুশ্রূষা, মুক্তিযোদ্ধাদের অবদান ও তথ্য সরবরাহ করে যুদ্ধে ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে এ দেশের অনেক নারী মুক্তি সেনা।পাক সেনাবাহিনী কর্তৃক ধর্ষিত হয় প্রায় তিন লক্ষ নারী। তারা মুক্তিযুদ্ধের সহযাত্রী এবং তাদের স্বীকৃতি হিসেবে সরকারি ভাবে তাদের ‘বীরঙ্গনা’ উপাধিতে ভূষিত করা হয়।

জনসাধারণঃ
সাধারন জনগনের সাহায্য-সহযোগিতা ও স্বাধীনতার প্রতি ঐকান্তিক আকাঙ্ক্ষার ফলে মাত্র নয় মাসের যুদ্ধে বাঙালি স্বাধীনতা অর্জন সম্ভব হয়েছে। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর মুষ্টিমেয় কিছু সংখ্যক দোসর ব্যতীত সবাই কোনো না কোনোভাবে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করে। সাধারণমানুষ মুক্তিযোদ্ধাদের আশ্রয় দিয়েছে, শত্রু অবস্থান ও চলাচলের তথ্য দিয়েছে, খাবার ও ওষুধ সরবরাহ করেছে, সেবা দিয়েছে ও খবরা-খবর সরবরাহ করেছে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে সাধারণ জনগণের পাশাপাশি ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর জনগণও এতে অংশগ্রহণ করে। অনেকে মুক্তিযুদ্ধে শহীদ হন। আমাদের মুক্তিযুদ্ধের ৩০ লাখ শহীদের মধ্যে সাধারণ মানুষের সংখ্যা ছিল অধিক। রক্তের বিনিময়ে আমাদের স্বাধীন মানচিত্র, লাল-সবুজ পতাকা।
স্বাধীনতা অর্জনে রাজনৈতিক ব্যক্তিদের অবদানঃ

বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনে রাজনৈতিক ব্যক্তিদের অবদান অপরিসীম। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতৃ বর্গ বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনে অনেক ত্যাগ স্বীকার করেছেন। নানা অত্যাচার নিপীড়ন সহ্য করেছেন। স্বাধীনতা সংগ্রামের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত জীবন বাজি রেখে রাজনৈতিক তৎপরতা চালিয়ে গেছেন।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বেঃ

বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে মূল নেতৃত্ব দেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। সারা জীবনের কর্মকাণ্ড আন্দোলন-সংগ্রাম নির্দেশিত হয়েছে বাঙালি জাতির মুক্তির লক্ষ্যে। এই লক্ষ্য নিয়ে তিনি ১৯৪৮ সালে ছাত্রলীগ এবং ১৯৪৯ সালে আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ হন।১৯৪৮ ও ১৯৫২ র ভাষা আন্দোলনে তিনি বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করেন। তিনি ছিলেন ভাষা আন্দোলনের প্রথম কারাবন্দীদের মধ্যে অন্যতম। কী সংসদ, কী রাজপথ, বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির পক্ষে তার কণ্ঠ ছিল সর্বদা সোচ্চার।

১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, ১৯৫৬ সালের সংবিধানে বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দান,১৯৫৮ সালে জেনারেল আইয়ুব খানের সামরিক শাসন বিরোধী আন্দোলন, ১৯৬৬ সালে ‘আমাদের বাঁচার দাবি ৬ দফা ‘ কর্মসূচি পেশ ও ৬ দফা ভিত্তিক আন্দোলন, ৬৯ এর গণঅভ্যুত্থান, ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নজিরবিহীন বিজয়, ১৯৭১ সালের অসহযোগ আন্দোলন থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা ও স্বাধীনতা অর্জনে একচ্ছত্র ভূমিকা পালন করেন স্বাধীনতার স্থপতি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। পাকিস্তানের ২৪ বছরের মধ্যে ১২ বছর তিনি কারাগারে কাটিয়েছেন। ২৫ মার্চ নিরস্ত্র বাঙালিদের উপর পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী সশস্ত্র আক্রমণে ঝাঁপিয়ে পড়লে ২৬ মার্চ ১৯৭১ প্রত্যুষে তিনি সরাসরি স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। সংগ্রামের পথ ধরে ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ তার ঐতিহাসিক ভাষণে তিনি মুক্তিযুদ্ধের ডাক দিয়েছেন। তার নামে আমাদের মুক্তিযুদ্ধ পরিচালিত হয়। তিনি ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক ও মুজিবনগর সরকারের রাষ্ট্রপতি। তাঁর বলিষ্ঠ ও আপোষহীন নেতৃত্বে আমরা স্বাধীনতা পেয়েছি।বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হলেন জাতির জনক স্বাধীনতার মহানায়ক ও স্বাধীনতা বাংলাদেশের স্থপতি।


সৈয়দ নজরুল ইসলামঃ
সৈয়দ নজরুল ইসলাম ছিলেন আওয়ামী লীগের অন্যতম শীর্ষ নেতা। তিনি মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন মুজিবনগর সরকারের উপরাষ্ট্রপতি ছিলেন। বঙ্গবন্ধুর অনুপস্থিতিতে সৈয়দ নজরুল ইসলাম ভারপ্রাপ্ত সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধকে বেগবান ও সফল করার জন্য তিনি সকলের প্রতি আহ্বান জানান। সৈয়দ নজরুল ইসলাম মুক্তিযুদ্ধের একজন অন্যতম সংগঠক ও পরিচালক ছিলেন।

তাজউদ্দীন আহমদঃ
মুক্তিযুদ্ধের সময় তাজউদ্দীন আহমদ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। তিনি ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বিশ্বস্ত ও ঘনিষ্ঠ সহচর। যুদ্ধ পরিচালনার জন্য গঠিত মুজিবনগর সরকারের (১০ এপ্রিল ১৯৭১)প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন এই মহান নেতা। ১৯৭১ সালের ১১ এপ্রিল তিনি বেতার ভাষণে মুজিবনগর সরকার গঠনের কথা প্রচার করেন। বঙ্গবন্ধুর অনুপস্থিতিতে মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনায় তিনি সফল নেতৃত্ব প্রদান করেন। মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনার জন্য গঠিত উপদেষ্টা কমিটির তিনি আহ্বায়ক ছিলেন। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের সঙ্গে তার নাম অঙ্গাঙ্গিভাবে যুক্ত।

ক্যাপ্টেন এম. মনসুর আলীঃ
ক্যাপ্টেন এম. মনসুর আলী আওয়ামী লীগের একজন শীর্ষ নেতা এবং বঙ্গবন্ধুর খুবই ঘনিষ্ঠ ছিলেন।মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি মুজিবনগর সরকারের অর্থমন্ত্রী ছিলেন। সে সময়ে খাদ্য বস্ত্র, অস্ত্র প্রশিক্ষণের জন্য অর্থের সংস্থান খুবই গুরু দায়িত্ব ছিল। তিনি সফল ভাবে সে দায়িত্ব পালন করেন।

এ. এইচ. এম. কামরুজ্জামানঃ
কামরুজ্জামান আওয়ামীলীগে আর একজন শীর্ষ নেতা।মুক্তি যুদ্ধের সময় তিনি সরকারের স্বরাষ্ট্র, ত্রাণ ও পুনর্বাসন মন্ত্রী ছিলেন। সে সময় তিনি ভারতে আশ্রয় নেয়া লক্ষ লক্ষ শরণার্থী জন্য ত্রাণ সংগ্রহ, ত্রাণ শিবিরে ত্রাণ বিতরণ এবং পরবর্তীতে শরণার্থীদের পুনর্বাসন ইত্যাদি দায়িত্ব অত্যন্ত সফলতার সঙ্গে পালন করেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনে তার অবদান অপরিসীম।

উপসংহারঃ
মুক্তিযোদ্ধা মানে লাল-সবুজের পতাকার সাথে সম্পর্কিত। এদের রক্তের বিনিময় দেশ স্বাধীন হয়েছে।তাদের ঋণ কোনদিন শোধ হবে না। মুক্তিযোদ্ধারা দেশকে শত্রুমুক্ত করার লক্ষ্যে মৃত্যুকে তুচ্ছ মনে করে যুদ্ধে যোগদান করেছিল।তাদের অসীম সাহসিকতায় পাকিস্থানি বাহিনীকে পরাজিত করতে পেরেছে। দীর্ঘ নয় মাস যুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন হয়। জীবনের মায়া ত্যাগ করে দেশকে শত্রুমুক্ত করে স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করে। মুক্তিযুদ্ধের ফলে আমরা পেয়েছি একটি স্বাধীন রাষ্ট্র, বিশ্বের মানচিত্রে স্থান পেয়েছে। এর মাধ্যমে বাঙালির হাজার বছরের স্বপ্ন পূরণ হলো। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ বিশ্বের নিপীড়িত, স্বাধীনতাকামী জনগণকে অনুপ্রাণিত করে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *