সমন্বয় ও নিঃসরণ – ৮ম শ্রেণি বিজ্ঞান ৫ম অধ্যায়

সমন্বয় ও নিঃসরণ

সমন্বয়ের অর্থ হচ্ছে সংযোগ, বণ্টন এবং সুষ্ঠুভাবে সম্পাদন করা। অর্থাৎ কাজের বিভিন্ন অংশর মধ্যে সংযোগ বিধানের প্রক্রিয়াকে সমন্বয় বলা হয়। অন্যভাবে বলা যায়, প্রাতিষ্ঠানিক লক্ষ্যার্জনের নিমিত্তে প্রতিষ্ঠানের নিয়োজিত বিভিন্ন ব্যক্তি ও বিভাগের প্রচেষ্টাবলিকে একস্থানে গ্রথিত, সংযুক্ত ও সুসংহত করার প্রক্রিয়াকে সমন্বয় বলে। সরু ছিদ্রপথে কোনো গ্যাসের অণুসমূহের উচ্চচাপ থেকে নিম্নচাপ অঞ্চলে বেরিয়ে আসার প্রক্রিয়াকে নিঃসরণ বলে। যেমন- পাকা কাঁঠালের সুগন্ধ ত্বকের ছিদ্র পথ দিয়ে বের হয়ে আসা। নিচে সমন্বয় ও নিঃসরণ – ৮ম শ্রেণি বিজ্ঞান ৫ম অধ্যায় টি বিস্তারিত দেওয়া আছে।

সমন্বয় ও নিঃসরণ

জীবে সমন্বয় একটি অতীব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। প্রাণীর মতো উদ্ভিদের বিভিন্ন কাজের মধ্যে সমন্বয় প্রয়োজন হয়। জীবের বৃদ্ধি, প্রজনন, বংশবিস্তার, অনুভূতিগ্রহণ ও প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি ইত্যাদি বৈশিষ্ট্য রয়েছে। উদ্ভিদের এ কাজগুলো করার জন্য হরমোনের পুরুত্ব অপরিসীম। এক্ষেত্রে প্রাণীর মতো উদ্ভিদের আলাদা কোনো ভগ্ন থাকে না। নিম্নশ্রেণি ব্যতীত উচ্চশ্রেণির প্রাণীর দেহে বিভিন্ন জৈবিক কার্যাদি সম্পাদনের জন্য নির্দিষ্ট ভগ্ন থাকে। দেহের বিভিন্ন অঙ্গের মধ্যে সংযোগ সাধন এবং এদের কাজের মধ্যে সমম্বয় সাধন করে উদ্দীপনার সাড়া দিয়ে পরিবেশের সাথে সম্পর্ক রক্ষা করে স্নায়ুতন্ত্র।

উদ্ভিদে সমন্বয়

প্রতিটি উদ্ভিদকোষে বিভিন্ন শারীরবৃত্তীয় কার্যক্রম একটি নিয়ম শৃঙ্খলার মাধ্যমে সংঘটিত হয়। এ কারণে সমন্বয় উদ্ভিদের একটি অপরিহার্য কার্যক্রম। এ সমন্বয় না থাকলে উদ্ভিদের জীবনে বিশৃঙ্খলা দেখা দেবে। একটি উদ্ভিদের জীবন চক্রের পর্যায়গুলো যেমন- অকুরোদগম, পুষ্পায়ন, ফল সৃষ্টি, বার্ধক্য প্রান্তি, সুস্তাকথা ইত্যাদি একটি সুশৃঙ্খল নিয়ম মেনে চলে। এ কাজে আবহাওয়া ও জলবায়ুজনিত প্রভাবকগুলোর পুরুত্বও লক্ষ করার মতো। উদ্ভিদের বৃদ্ধি ও চলনসহ বিভিন্ন শারীরবৃত্তীয় কাজগুলো অত্যন্ত সুশৃঙ্খলভাবে বিশেষ নিয়ম মেনেই সম্পন্ন হয়।

একটি কাজ জন্য কাজকে বাধা প্রদান করে না। বিভিন্ন কাজের সমন্বয়সাধন কীভাবে হয় তা জানতে বিজ্ঞানীরা চেষ্টা করতে থাকেন এবং মত প্রকাশ করেন যে, উদ্ভিদের বৃদ্ধি ও বিকাশ, বিভিন্ন অঙ্গ সৃষ্টি ইত্যাদি উদ্ভিদ দেহে উৎপাদিত বিশেষ কোনো জৈব রাসায়নিক পদার্থের প্রভাবে হয়ে থাকে। উদ্ভিদের সকল কাজ নিয়ন্ত্রণকারী এই জৈব রাসায়নিক পদার্থটিকে ফাইটোহরমোন বা বৃদ্ধিকারক বস্তু হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। ফাইটোহরমোন কোষে উৎপন্ন হয় এবং উৎপত্তিস্থল থেকে বাহিত হয়ে দূরবর্তী স্থানের কোষের কার্যাবলি নিয়ন্ত্রণ করে।

উদ্ভিদে যেসব হরমোন পাওয়া যায় তার মধ্যে অক্সিন, জিব্বেরেলিন ও সাইটোকাইনিন বৃদ্ধি সহায়ক এবং অ্যাবসাইসিক এসিড ও ইথিলিন বৃদ্ধি প্রতিবন্ধক হিসেবে কাজ করে। পাতায় ফ্লোরিজেন নামক হরমোন উৎপন্ন হয় এবং তা পত্রমূলে স্থানান্তরিত হয়ে পত্র মুকুলকে পুষ্পমুকুলে পরিণত করে। তাই দেখা যায় ফ্লোরিজেন উদ্ভিদে ফুল উৎপন্ন করে।

অক্সিন :

চার্লস ডারউইন এ হরমোন প্রথম আবিষ্কার করেন। তিনি উদ্ভিদের ভ্রূণমুকুলাবরণীর উপর আলোর প্রভাব লক্ষ করেন। যখন আলো তীর্যকভাবে একদিকে লাগে তখন ভ্রূণমুকুলাবরণী আলোর উৎসের দিকে বাঁকা হয়ে বৃদ্ধি লাভ করে। প্রকৃতপক্ষে ভ্রূণমুকুলাবরণীর অগ্রভাগে অবস্থিত রাসায়নিক পদার্থটি ছিল বৃদ্ধি সহায়ক হরমোন অক্সিন। অক্সিন প্রয়োগে শাখা কলমে মূল গজায়, ফলের অকালে ঝরে পড়া রোধ করে।

জিব্বেরেলিন :

চারাগাছ, বীজপত্র ও পত্রের বর্ধিষ্ণু অঞ্চলে এদের দেখা যায়। এর প্রভাবে উদ্ভিদের পর্বমধ্যগুলো দৈর্ঘ্যে বৃদ্ধি পায়। এ জন্য খাটো উদ্ভিদে এ হরমোন প্রয়োগ করলে উদ্ভিদটি অন্যান্য সাধারণ উদ্ভিদ থেকেও অধিক লম্বা হয়। বীজের সুপ্তাবস্থা কাটাতে এর কার্যকারিতা রয়েছে।

ইথিলিন :

এ হরমোনটি একটি গ্যাসীয় পদার্থ। এটি ফল পাকাতে সাহায্য করে। এ হরমোন ফল, ফুল, বীজ, পাতা ও মূলেও দেখা যায়। ইথিলিন বীজ এবং মুকুলের সুপ্তাবস্থা ভঙ্গ করে, চারা গাছের কাণ্ডের বৃদ্ধি ঘটিয়ে চারা গাছকে লম্বা হতে সাহায্য করে, ফুল এবং ফল সৃষ্টির সূচনা করে। ইথিলিন পাতা, ফুল এবং ফলের ঝরে পড়া ত্বরান্বিত করে।

চলন :

উদ্ভিদও অন্যান্য জীবের মতো অনুভূতি ক্ষমতাসম্পন্ন। এজন্য অভ্যন্তরীণ বা বহিঃউদ্দীপক উদ্ভিদদেহে যে উদ্দীপনা সৃষ্টি করে তার ফলে উদ্ভিদে চলন ও বৃদ্ধি সংঘটিত হয়। এসব চলনকে ট্রফিক চলন বলা হয়।

স্নায়ু তন্ত্র

তোমরা ষষ্ঠ শ্রেণিতে শ্রেণিবিন্যাস থেকে এককোষী ও বহুকোষী জীবের বৈশিষ্ট্য জেনেছ। বহুকোষী জীবের দেহে টিস্যু, অঙ্গ ও তন্ত্র ইত্যাদির ভিন্ন ভিন্ন গঠন পরিলক্ষিত হয়। বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে ছড়িয়ে রয়েছে অগণিত কোষের বিচিত্র কর্মকাণ্ড। এই কর্মকাণ্ডের সাথে যোগসূত্র রচনা করা এবং পরিবেশের সাথে সম্পর্ক রাখার জন্য জীবদেহে দ্রুত যোগাযোগ রক্ষা করা প্রয়োজন। যেমন- কারো দুঃখে তোমার কান্না পায়, কারো খুশিতে তুমি খুশি হও, পরীক্ষায় ভালো ফল করলে তোমার আনন্দ হয়। এই কাজগুলো ঘটে বিভিন্ন উদ্দীপকের কার্যকারিতার ফলে।

দেহের বিভিন্ন অংশের উদ্দীপনা বহন করা, দেহের বিভিন্ন অঙ্গের কাজের সমন্বয় সাধন করা ও পরিবেশের সাথে সম্পর্ক রাখা স্নায়ুতন্ত্রের প্রধান কাজ। প্রাণিদেহের যে তন্ত্র দেহের বিভিন্ন অঙ্গের সংযোগ রক্ষা করে, বিভিন্ন জৈবিক কার্যাবলীর সমন্বয় সাধন করে এবং উদ্দীপনায় সাড়া দিয়ে উপযুক্ত প্রতিবেদন সৃষ্টি করার মাধ্যমে পরিবেশের সাথে সম্পর্ক রক্ষা করে তাকে স্নায়ুতন্ত্র বলে। স্নায়ুতন্ত্রের প্রধান অংশ হলো মস্তিষ্ক। উন্নত মস্তিষ্কের কারণে মানুষ সৃষ্টির সেরা জীব হিসেবে পরিগণিত হয়। মস্তিষ্ক অসংখ্য বিশেষ কোষ দ্বারা গঠিত। এরা নিউরন বা স্নায়ুকোষ নামে পরিচিত।

স্নায়ুতন্ত্রের গঠন ও কার্যকরী একককে স্নায়ুকোষ বা নিউরন বলে। নিউরন মানবদেহের দীর্ঘতম কোষ। নিউরন দুইটি প্রধান অংশ নিয়ে গঠিত। যথা- ১. কোষদেহ এবং ২. প্রলম্বিত অংশ।

১. কোষদেহ :

কোষদেহ নিউরনের প্রধান অংশ। কোষদেহ বিভিন্ন আকৃতির হয় যেমন— গোলাকার, ডিম্বাকার বা নক্ষত্রাকার। কোষদেহ কোষ আবরণী, সাইটোপ্লাজম ও নিউক্লিয়াস দ্বারা গঠিত। এই কোষে সেন্ট্রিওল থাকে না। তাই এরা অন্যান্য কোষের মতো বিভাজিত হয় না।

২. প্রাম্বিত অংশ :

কোষদেহ থেকে উৎপন্ন শাখা-প্রশাখাকে প্রলম্বিত অংশ বলে। প্রলম্বিত অংশ দুই প্রকার। যথা- ক) অ্যাক্সন এবং খ) ডেনড্রন।

ক) অ্যাক্সন :

কোষদেহ থেকে উৎপন্ন লম্বা সুতার মতো অংশকে অ্যাক্সন বলে। অ্যাক্সনের যে প্রান্তে কোষদেহ থাকে তার বিপরীত প্রান্ত থেকে শাখা বের হয়। সাধারণত একটি নিউরনে একটি মাত্র অ্যাক্সন থাকে।

খ) ডেনড্রন :

কোষদেহের চারদিক থেকে উৎপন্ন শাখাগুলোকে ডেনড্রন বলে। এগুলো বেশি লম্বা হয় না। ডেনড্রন থেকে সৃষ্ট শাখাগুলোকে ডেনড্রাইট বলে। এদের দ্বারা স্নায়ুতাড়না নিউরনের দেহের দিকে পরিবাহিত হয়। একটি স্নায়ুকোষের অ্যাক্সন অন্য একটি স্নায়ুকোষের ডেনড্রাইটের সাথে মিলিত হওয়ার স্থানকে সিন্যাপস বলে। সিন্যাপসের মাধ্যমেই স্নায়ুতাড়না এক স্নায়ুকোষ থেকে অন্য স্নায়ুকোষে পরিবাহিত হয়। উদ্দীপনা বহন করা, প্রাণিদেহের ভিতরের ও বাইরের পরিবেশের সাথে সংযোগ রক্ষা করা, প্রাণিদেহের বিভিন্ন অঙ্গের মধ্যে কাজের সমন্বয় সাধন করা, মস্তিষ্কে স্মৃতিধারণ করা, চিন্তা করা ও বিভিন্ন কাজের নির্দেশ দেওয়া ও পরিচালনা করা নিউরনের কাজ। নিউরনের উদ্দীপনা বহন প্রক্রিয়া নিচের চিত্রে দেখানো হলো।

মস্তিষ্ক

১. কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্র : কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রের অংশ হলো মস্তিষ্ক ও মেরুরজ্জু।

মস্তিষ্ক হলো সমগ্র স্নায়ুতন্ত্রের চালক। মানুষের মস্তিষ্ক করোটির মধ্যে সুরক্ষিত। মস্তিষ্ক মেনিনজেস নামক পর্দা দ্বারা আবৃত। মানুষের মস্তিষ্কের প্রধান অংশ তিনটি। যথা- (ক) গুরুমস্তিষ্ক (খ) মধ্যমস্তিষ্ক (গ) পশ্চাৎ বা লঘুমস্তিষ্ক।

(ক) গুরুমস্তিষ্ক :

মস্তিষ্কের প্রধান অংশ হলো গুরুমস্তিষ্ক বা সেরিব্রাম। এটা ডান ও বাম খণ্ডে বিভক্ত। এদের ডান ও বাম সেরিব্রাল হেমিস্ফিয়ার বলে। মানব মস্তিষ্কে সেরিব্রাল হেমিস্ফিয়ার অধিকতর উন্নত ও সুগঠিত। এই দুইখণ্ড ঘনিষ্ঠভাবে স্নায়ুতন্তু দ্বারা সংযুক্ত। এর উপরিভাগ ঢেউ তোলা ও ধূসর বর্ণের। দেখতে ধূসর বর্ণের হওয়ায় একে ধূসর পদার্থ বা গ্রে ম্যাটার বলে। গুরুমস্তিষ্কের অন্তঃস্তরে কেবলমাত্র স্নায়ুতন্তু থাকে। স্নায়ুতন্তুর রং সাদা। তাই মস্তিষ্কের ভিতরের স্তরের নাম শ্বেত পদার্থ বা হোয়াইট ম্যাটার।

শ্বেত পদার্থের ভিতর দিয়ে স্নায়ুতন্তু এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যায়। ধূসর পদার্থের কয়েকটি স্তরে বিশেষ আকারে স্নায়ুকোষ দেখা যায়। এই স্নায়ুকোষগুলো গুরুমস্তিষ্কের বিভিন্ন অংশে গুচ্ছ বেঁধে স্নায়ুকেন্দ্র সৃষ্টি করে। এগুলো বিশেষ বিশেষ কর্মকেন্দ্র হিসেবে কাজ করে। দর্শন, শ্রবণ, ঘ্রাণ, চিন্তা- চেতনা, স্মৃতি, জ্ঞান, বুদ্ধি, বিবেক ও পেশি চালনার ক্রিয়াকেন্দ্র গুরুমস্তিষ্কে অবস্থিত।

সেরিব্রামের নিচের অংশ হলো- থ্যালামাস ও হাইপোথ্যালামাস। এগুলো ধূসর পদার্থের পুঞ্জ। ক্রোধ, লজ্জা, গরম, শীত, নিদ্রা, তাপ সংরক্ষণ ও চলন এই অংশের কাজ।

(খ) মধ্যমস্তিক :

গুরুমস্তিষ্ক ও পনস-এর মাঝখানে মধ্যমস্তিষ্ক অবস্থিত। মধ্যমস্তিষ্ক দৃষ্টিশক্তি, শ্রবণশক্তির সাথেও সম্পর্কযুক্ত।

(গ) পচাৎ বা লঘুমস্তিষ্ক :

লঘুমস্তিষ্ক গুরুমস্তিষ্কের নিচে ও পশ্চাতে অবস্থিত। এটা গুরুমস্তিস্কের চেয়ে আকারে ছোট। দেহের ভারসাম্য রক্ষা করা পশ্চাৎ বা লঘুমস্তিষ্কের প্রধান কাজ। এছাড়া লঘুমস্তিষ্ক কথা বলা ও চলাফেরা নিয়ন্ত্রণ করে। এর তিনটি জল-

সেরিবেলাম : পনসের বিপরীতদিকে অবস্থিত খণ্ডাংশটি হলো সেরিবেলাম। এটা অনেকটা বুলন্ত অবস্থায় থাকে। সেরিবেলাম ডান ও বাম দৃঅংশে বিভক্ত।

পাস : পনস লঘুমস্তিষ্কের সামনে ও নিচে অবস্থিত। একে মস্তিষ্কের যোজক বলা হয়। এটা পুরুষস্তিষ্ক, লঘুমস্তিষ্ক ও মধ্যমস্তিষ্ককে সুৰুয়াশীর্ষকের সাথে সংযোজিত করে।

মেলা বা সুক্ষ্মাশীৰ্বক : এটা মস্তিষ্কের নিচের অংশ। সুন্নাশীর্বক পনসের নিম্নভাগ থেকে মেরুরজ্জুর উপরিভাগ পর্যন্ত বিস্তৃত। অর্থাৎ এটা মস্তিষ্ককে মেরুরজ্জুর সাথে সংযোজিত করে। এ জন্য সুরাশীর্বকে মস্তিষ্কের বোঁটা বলা হয়। মস্তিকের এ অংশ হৃৎস্পন্দন, খাদ্যগ্রহণ ও শ্বসন ইত্যাদি কাজ নিয়ন্ত্রণ করে।

মেরুরুজ্জু

মেরুদণ্ডের মধ্যে মেরুরজ্জু সরক্ষিত থাকে। মেরুরজ্জুর ধূসর পদার্থ থাকে ভিতরে এবং শ্বেত পদার্থ থাকে বাইরে অর্থাৎ মস্তিষ্কের উল্টা। মেরুরজ্জুর শ্বেত পদার্থের ভিতর দিয়ে ভালবাহী এবং অনুভূতিবাহী স্নাত যাতায়াত করে।

প্রতিবর্ত চক্র

তোমার হাতে মশা বসলে তুমি কী করবে? অবশ্যই মশাটাকে মারতে চেষ্টা করবে। তোমার হাতে মশা বসেছে তুমি কীভাবে টের পেলে? ভূমি মশার কামড় অনুভব করেছ, তাই তুমি এমনটি করেছ। তুমি যার কাযয় অনুভব করেছ স্নায়ুর উদ্দীপনার জন্য। স্নায়ুর ক্রিয়া যা উদ্দীপনার সাড়া দেওয়াও তাই। আয়নাতে জানো ফেনার সঙ্গে সঙ্গে যেমন ভালো প্রতিফলিত হয়, প্রতিবর্ত ক্রিয়াও কতকটা তেমনি। প্রতিবর্ত ক্রিয়া ঘটে স্নায়ুর তাড়নার তাৎক্ষণিক কার্যকারিতার ফলে। স্নায়ুতাড়না কী? স্নায়ুর ভিতর দিয়ে যে সংবাদ বা অনুভূতি প্রবাহিত হয় তাকে স্নায়ু তাড়না বলে।

আমরা যেমন হাতে মশা কামড় দিলে মশা তাড়িয়ে দেই অথবা হাতে বা পায়ে পিন ফুটলে আমরা নিমিষে তা সরিয়ে নেই। এটা কীভাবে ঘটে? হাতের উপর মশা বসলে স্নায়ুর গ্রাহক প্রান্তের উদ্দীপক হলো মশা, এর উপস্থিতি অনুভব করার সঙ্গে সঙ্গে কোষ প্রান্তের সাড়া জাগে। আমরা মশাটিকে তাড়িয়ে দেই অথবা মেরে ফেলি। এ সকল ক্রিয়া যেন অজ্ঞাতসারে আপনা আপনি হয়ে থাকে। এরূপ যে ক্রিয়া অনুভূতির উত্তেজনা দ্বারা উৎপন্ন হয়, মস্তিষ্ক দ্বারা চালিত হয় না তাকেই প্রতিবর্ত ক্রিয়া বলে।

প্রতিটি প্রতিবর্ত চক্রের পাঁচটি অংশ থাকে। যথা- ১) গ্রাহক অঙ্গ ২) অনুভূতিবাহী স্নায়ু ৩) প্রতিবর্ত কেন্দ্র ৪) আজ্ঞাবাহী স্নায়ু এবং ৫) সাড়া প্রদানকারী অঙ্গ। তাৎক্ষণিক আত্মরক্ষার জন্য কোনো অঙ্গের তড়িৎক্রিয়ার নাম প্রতিবর্ত ক্রিয়া। উদাহরণ- ১) আগুনে হাত লাগা বা পিনে হাত ফোটা মাত্র টেনে নেওয়া। ২) চোখে প্রথম আলো পড়ামাত্র চোখের পাতা বন্ধ হয়ে যাওয়া।

ব্যাখ্যা :

হাতের চামড়ায় পিন ফোটামাত্র অনুভূতিবাহী স্নায়ুতন্ত্র পিন ফোটার যন্ত্রণা গ্রহণ করে। এই যন্ত্রণাদায়ক তাড়না অনুভূতিবাহী স্নায়ুতন্ত্রর মাধ্যমে মেরুরজ্জুতে পৌঁছে। ঐ একই তাড়না অনুভূতিবাহী স্নায়ুকোষ থেকে আজ্ঞাবাহী স্নায়ুতে প্রবাহিত হয়। স্নায়ুতাড়না আজ্ঞাবাহী কোষে পৌঁছামাত্র পেশিতে প্রেরণ করে। ফলে পেশি সংকুচিত হয় এবং যন্ত্রণার উৎস থেকে হাত সরিয়ে দেয়।

এখানে অত্যন্ত জটিল একটি প্রক্রিয়াকে সহজ করে বর্ণনা করা হলো। আসলে পিন ফুটানোর সঙ্গে সঙ্গে বেশকিছু অনুভূতিবাহী স্নায়ু উদ্দীপনা গ্রহণ করে। এ উদ্দীপনা অনেকগুলো পরস্পর সংযুক্ত স্নায়ুকোষের মাধ্যমে অনেকগুলো আজ্ঞাবাহী কোষে প্রবাহিত হয়। এসব আজ্ঞাবাহী স্নায়ু পেশিতে উদ্দীপনা বহন করে হাত সরিয়ে আনে। অনুভূতি মস্তিষ্কেও পৌঁছায়। ফলে কী ঘটছে শরীর তা জানতে পারে।

প্রতিবর্ত ক্রিয়া একটি সমন্বিত কার্যক্রম। প্রতিবর্ত ক্রিয়ায় যে পাঁচটি অংশ কাজ করে এদের যেকোনো একটির অভাবে কাজটি সঠিকভাবে হতে পারে না।

রেচনতন্ত্র

আমরা নাক দিয়ে নিঃশ্বাস ছাড়ি। অতি গরমে গা ঘামে। এগুলো রেচন পদার্থ। অর্থাৎ রেচন পদার্থ হলো সেইসব পদার্থ যেগুলো দেহের জন্য ক্ষতিকর ও অপ্রয়োজনীয়। রেচন কাতে দেহের বর্জ্য পদার্থ নিষ্কাশন ব্যবস্থাকে বোঝায়। বিপাকের ফলে পানি, কার্বন ডাইঅক্সাইড, ইউরিয়া প্রভৃতি দূষিত পদার্থ দেহে প্রস্তুত হয়। এগুলো নিয়মিত ত্যাগ না করলে স্বাস্থ্যহানি ঘটে। এইসব দূষিত পদার্থ দেহের মধ্যে জমে বিষক্রিয়া দেখা দেয় এবং এর ফলে মৃত্যুও ঘটতে পারে। এ সকল বর্জ্য পদার্থ প্রধানত নিঃশ্বাস বায়ু, ঘাম এবং মূত্রের সাথে দেহের বাইরে চলে যায়।

ফুসফুস, চর্ম ও বৃক্ক এই তিনটি রেচন অঙ্গ। কার্বন ডাইঅক্সাইড ফুসফুসের মাধ্যমে এবং লবণ জাতীয় ক্ষতিকর পদার্থ চর্মের মাধ্যমে বের হয়ে যায়। বৃক্কের মাধ্যমে দেহের নাইট্রোজেনযুক্ত তরল, দূষিত পদার্থ পরিত্যক্ত হয়। মূত্রের মাধ্যমেই দেহের শতকরা আশি ভাগ নাইট্রোজেন ঘটিত বর্জ্য পদার্থ পরিত্যক্ত হয়। তাই বৃক্কই প্রধানত রেচন অঙ্গ বলে বিবেচিত হয়। যে তন্ত্র রেচন কার্যে সাহায্য করে তাকে রেচনতন্ত্র বলে।

পদ্ধতি :

একটি টেস্টটিউবের ভিতর কিছুটা স্বচ্ছ চুনের পানি নাও। এবার টেস্টটিউবটির মধ্যে কাচ বা প্লাস্টিকের নল প্রবেশ করাও এবং নলটিতে ফুঁ দাও। কী হয় লক্ষ করো। কিছুক্ষণ ফুঁ দেওয়ার পর দেখবে চুনের পানি ঘোলাটে
হয়ে যাচ্ছে। কেন এমন হলো?

আমরা জানি, কার্বন ডাইঅক্সাইড চুনের পানিকে ঘোলা করে। এ থেকে প্রমাণিত হয় যে, আমাদের নিঃশ্বাসের বায়ুতে কার্বন ডাইঅক্সাইড আছে।

অল্প পরিমাণ কার্বন ডাইঅক্সাইড দেহের জন্য তেমন ক্ষতিকর নয়। কিন্তু বেশি পরিমাণ কার্বন ডাইঅক্সাইড বিষাক্ত যা দেহের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। শ্বসন ক্রিয়ার সময় আমাদের দেহকোষ বর্জ্য হিসেবে এই গ্যাস তৈরি করে। কোষ থেকে রক্ত কার্বন ডাইঅক্সাইড বহন করে ফুসফুসে নিয়ে যায়। নিঃশ্বাসের বায়ুতে শতকরা ৪ ভাগ কার্বন ডাইঅক্সাইড থাকে। নিঃশ্বাসের বায়ুতে কার্বন ডাইঅক্সাইডের সাথে জলীয় বাষ্প থাকে।

ঘর্ম বা ঘাম

মানবদেহের বহিরাবরণ চর্ম বা ত্বক। ত্বকে অসংখ্য ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ছিদ্র থাকে। এগুলো হলো লোমকূপ। এই সকল লোমকূপ দিয়ে ঘাম বের হয়। এই ঘামে সাধারণত পানির সাথে লবণ ও সামান্য কার্বন ডাইঅক্সাইড এবং অন্যান্য ক্ষতিকর বা অপ্রয়োজনীয় পদার্থ থাকে।

মূত্র

বৃক্ককে মূত্র তৈরির কারখানা হিসেবে অভিহিত করা হয়। দেহের পেছনের দিকে মেরুদণ্ডের দুই পাশে দুইটি বৃক্ক থাকে। বৃক্ক ছাঁকনির মতো কাজ করে। যকৃৎ আমাদের দেহের অতিরিক্ত অ্যামাইনো এসিডকে ভেঙ্গে ইউরিয়া, ইউরিক এসিড, অ্যামোনিয়া ইত্যাদি নাইট্রোজেন ঘটিত বর্জ্য পদার্থ তৈরি করে। এগুলো দেহের জন্য ক্ষতিকর। বৃক্ক রক্ত থেকে ক্ষতিকর পদার্থ ছেঁকে নেয়। এই ক্ষতিকর পদার্থসমূহ পানির সাথে মিশে হালকা হলুদ বর্ণের মূত্র তৈরি করে এবং ইউরেটারের মাধ্যমে মূত্র থলিতে জমা হয়। নির্দিষ্ট সময় পর মূত্রের বেগ অনুভূত হয়। মলদ্বারের মতো মূত্রথলির দ্বারেও সংকোচন ও প্রসারণ পেশি থাকে। একে মূত্রপথ বলে। প্রয়োজনে পেশি সংকোচন ও প্রসারণের ফলে দেহ থেকে মূত্র নির্গত হয়।

শেষ কথা

৮ম শ্রেণির একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হচ্ছে সমন্বয় ও নিঃসরণ। এখানে এই সম্পর্কে বিস্তারিত পাঠ্যসূচি শেয়ার করেছি। যাদের কাছে বই নেই, এখানে দেওয়া সমন্বয় ও নিঃসরণ অধাত টি পড়ে নিতে পারেন।

আরও দেখুনঃ

জীবের বৃদ্ধি ও বংশগতি অষ্টম শ্রেণি বিজ্ঞান ২য় অধ্যায়

2 Comments on “সমন্বয় ও নিঃসরণ – ৮ম শ্রেণি বিজ্ঞান ৫ম অধ্যায়”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *